দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থানার আলোচিত দানিউল হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, গ্রেফতার ৩
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থানার আলোচিত দানিউল হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন, গ্রেফতার ৩
দিনাজপুরের বীরগঞ্জ থানার বহুল আলোচিত ও দীর্ঘদিনের ক্লুলেস দানিউল হত্যা মামলার রহস্য উদঘাটন করেছে দিনাজপুর জেলা পুলিশ। অভিযানে মূল পরিকল্পনাকারীসহ তিনজন অভিযুক্তকে গ্রেফতার করা হয়েছে।
দিনাজপুর জেলার পুলিশ সুপার মোঃ জেদান আল মুসা, পিপিএম-এর দিকনির্দেশনা ও সরাসরি তত্ত্বাবধানে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম অ্যান্ড অপস) মোঃ আনোয়ার হোসেন-এর সার্বিক সহযোগিতায় জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) ও বীরগঞ্জ থানা পুলিশ যৌথভাবে এই হত্যাকাণ্ডের তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করে।
প্রযুক্তিগত বিশ্লেষণে অবস্থান শনাক্ত
মামলাটি দীর্ঘদিন রহস্যজনক থাকায় জেলা গোয়েন্দা শাখা ও বীরগঞ্জ থানা পুলিশ প্রযুক্তিগত তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের মাধ্যমে সন্দেহভাজন কয়েকজনের অবস্থান খুলনা ও বাগেরহাট জেলায় শনাক্ত করে। অবস্থান নিশ্চিত হওয়ার পর দিনাজপুর জেলা গোয়েন্দা শাখার একটি চৌকস টিম ৮ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে খুলনা ও বাগেরহাট জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে।
অভিযানে সরাসরি অভিযুক্তদের গ্রেফতার করা সম্ভব না হলেও অভিযুক্ত আবু বক্কর ওরফে বাদশার ভাড়া বাসা থেকে একটি দেশীয় ধারালো অস্ত্র উদ্ধার করা হয়। এছাড়াও স্থানীয়ভাবে অনুসন্ধানে জানা যায়, অপর অভিযুক্ত ব্যক্তি একজন দুর্ধর্ষ অপরাধী।
খুলনা থেকে প্রধান অভিযুক্ত গ্রেফতার
পরবর্তীতে ১৬ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে বীরগঞ্জ থানার মামলা নং-১২, তাং-১৩/১২/২০২৫ খ্রি., ধারা-৩০২/৩৪ পেনাল কোড-১৮৬০ এর তদন্তের ধারাবাহিকতায় দিনাজপুর জেলা পুলিশের একটি চৌকস টিম র্যাব-০৬, খুলনার সহযোগিতায় খুলনা রেলওয়ে স্টেশন এলাকা থেকে অভিযান পরিচালনা করে প্রধান অভিযুক্ত—
মোঃ আবু বক্কর ওরফে বাদশা (২৬)
পিতা: মোঃ মোতালেব শেখ
সাং: উৎকুল
থানা: বাগেরহাট সদর
জেলা: বাগেরহাট
—কে গ্রেফতার করে।
স্বীকারোক্তিতে বেরিয়ে আসে পুরো পরিকল্পনা
গ্রেফতারকৃত আবু বক্কর ওরফে বাদশার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মামলার অন্যতম আসামি—
মোঃ শাহ আলম কল্লোল (৫৬)
পিতা: মৃত আলহাজ রজব আলী মোল্লা
মাতা: মৃতা আলহাজ সামসুন্নাহার
সাং: মহারাজা মোড়, উত্তর বালুবাড়ী
জেলা: দিনাজপুর
—কে তার নিজ বাসা থেকে গ্রেফতার করা হয়।
পরবর্তীতে শাহ আলম কল্লোলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী মামলার আরেক আসামি—
মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি (৪১)
স্বামী: মৃত দানিউল ইসলাম
সাং: আরাজি চৌপুকুরিয়া
থানা: বীরগঞ্জ
জেলা: দিনাজপুর
—কে তার নিজ বাসভবন থেকে গ্রেফতার করা হয়।
১০ লক্ষ টাকায় ভাড়াটে খুনী নিয়োগ
তদন্তে জানা যায়, অভিযুক্ত শাহ আলম কল্লোল ও মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি পরস্পর যোগসাজশে অভিযুক্ত আবু বক্কর ওরফে বাদশার মাধ্যমে ১০,০০০০০/- (দশ লক্ষ) টাকার বিনিময়ে পেশাদার খুনী ভাড়া করেন।
গত ৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে বীরগঞ্জ থানাধীন আরাজি চৌপুকুরিয়া গ্রামস্থ জিন্দাপীর মেলা চলাকালীন বিপুল লোকসমাগমকে হত্যার জন্য উপযুক্ত সময় হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। এই সময় আবু বক্কর ওরফে বাদশার মাধ্যমে অজ্ঞাত ভাড়াটে খুনী চক্রকে দিনাজপুরে ডেকে আনা হয়।
হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি দানিউলের বাসায় কিভাবে প্রবেশ করে হত্যাকাণ্ড চালানো হবে তার একটি শর্ট ভিডিও তৈরি করে শাহ আলম কল্লোলের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে পাঠান।
পরবর্তীতে আবু বক্কর ওরফে বাদশা দিনাজপুর সদরের বালুবাড়ীতে শাহ আলম কল্লোলের সাথে সাক্ষাৎ করে দানিউলের বাসার চাবি গ্রহণ করেন এবং পূর্বে করা রেকির অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়নে রওনা হন।
ভোররাতে নৃশংস হত্যাকাণ্ড
গত ১৩ ডিসেম্বর ২০২৫ তারিখে আনুমানিক ভোররাতে আবু বক্কর ওরফে বাদশা তার সঙ্গীয় পেশাদার খুনী বাহিনীসহ দানিউলের গলা কেটে হত্যা নিশ্চিত করে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত শাহ আলম কল্লোল বিজ্ঞ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি প্রদান করেন।
হত্যাকাণ্ডের পটভূমি
উল্লেখ্য, দানিউল ইসলাম পেশায় একজন স্বচ্ছল কৃষক ছিলেন। গত ১৩ জানুয়ারি ২০২৫ তারিখে আনুমানিক রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে তার নিজ শয়নকক্ষের বিছানার ওপর গলাকাটা লাশ পড়ে থাকতে দেখা যায়। ঘটনাটি ছিল অত্যন্ত চাঞ্চল্যকর, রহস্যজনক ও দীর্ঘদিন ক্লুলেস।
অভিযুক্তরা হত্যার দায় স্বীকার করেছেন এবং অভিযুক্ত আবু বক্কর ওরফে বাদশার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে দানিউলের বাড়ির প্রায় ১০০ গজ সামনে অবস্থিত একটি পুকুর থেকে হত্যাকাণ্ডের সময় ফেলে দেওয়া সিসিস্টের বাসার তালাচাবি উদ্ধার করা হয়।
আসামিদের নাম ও ঠিকানা
১. মোঃ আবু বক্কর ওরফে বাদশা (২৬)
পিতা: মোঃ মোতালেব শেখ
সাং: উৎকুল
থানা: বাগেরহাট সদর
জেলা: বাগেরহাট
২. মোঃ শাহ আলম কল্লোল (৫৬)
পিতা: মৃত আলহাজ রজব আলী মোল্লা
মাতা: মৃতা আলহাজ সামসুন্নাহার
সাং: মহারাজা মোড়, উত্তর বালুবাড়ী
জেলা: দিনাজপুর
৩. মোছাঃ সুলতানা রাজিয়া ওরফে পপি (৪১)
স্বামী: মৃত দানিউল ইসলাম
সাং: আরাজি চৌপুকুরিয়া
থানা: বীরগঞ্জ
জেলা: দিনাজপুর
মামলার অতিরিক্ত তথ্য
অভিযুক্ত আবু বক্কর বাদশার বিরুদ্ধে নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম থানার এফআইআর নং-৪০, তারিখ-২৮/০১/২০২৪ খ্রি., জিআর নং-৪৩, ধারা-৯৫/৯৮/১০৫ সড়ক পরিবহন আইন ২০১ অনুযায়ী অভিযোগপত্রে সে অভিযুক্ত রয়েছে (তদন্তপ্রাপ্ত)।
মামলাটি বর্তমানে তদন্তাধীন রয়েছে। তদন্ত কার্যক্রম শেষে বিজ্ঞ আদালতে পুলিশ রিপোর্ট দাখিল করা হবে।




আজকের আইটির নীতিমালা মেনে কমেন্ট করুন। প্রতিটি কমেন্ট রিভিউ করা হয়।
comment url